Friday, August 7

সৌরভ দত্ত, কলকাতা: কলকাতার কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায় ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে শনিবার ভোররাতে ঘটে গেল এক নাটকীয় পুলিশি অভিযান। রাতের অন্ধকার কাটার আগেই শালবনি থানার পুলিশ, কলকাতা পুলিশের সহযোগিতায় এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পটুয়াপাড়ার বাড়িতে তল্লাশি চালায়। এই তল্লাশিকে ঘিরে সকাল থেকেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল চর্চা।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক তথা ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুমিত রায়ের খোঁজেই এই অভিযান চালানো হয়। শালবনির এক তৃণমূল নেতার অভিযোগ, দলীয় টিকিট পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সুমিত রায় তাঁর কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। পরে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় প্রতারণার অভিযোগ দায়ের করা হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে শালবনি থানার পুলিশ।

তদন্ত চলাকালীন সুমিত রায়ের মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন যে তাঁর অবস্থান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের পটুয়াপাড়ার বাড়ির আশপাশে ছিল। সেই সূত্র ধরেই সেখানে তল্লাশি চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, তদন্তকারীদের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য ছিল যে সুমিত রায় ওই বাড়িতেই থাকতে পারেন। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই রাতারাতি অভিযান সংগঠিত করা হয়।

জানা গিয়েছে, শুক্রবার গভীর রাতে শালবনি থানার একটি বড় পুলিশ দল ডিএসপির নেতৃত্বে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত প্রায় আড়াইটে নাগাদ কালীঘাট থানায় পৌঁছয়। নিয়ম মেনে স্থানীয় থানায় জেনারেল ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত করার পর অভিযানে নামে পুলিশ। এর কিছুক্ষণ পরই, ভোর প্রায় তিনটে নাগাদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে পৌঁছে যায় শালবনি থানার পুলিশ, কলকাতা পুলিশের আধিকারিক এবং মহিলা পুলিশ কর্মীদের নিয়ে গঠিত দল।

অভিযানের সময় বাড়ির চারপাশে মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে। সূত্রের খবর, বাড়ির গেট এবং আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলা হয় যাতে কেউ ভিতর থেকে বেরিয়ে যেতে বা বাইরে থেকে প্রবেশ করতে না পারেন। এরপর পুলিশ বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করা হলেও প্রথমদিকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে দাবি তদন্তকারী সূত্রের।

পুলিশের একাংশের দাবি, তাঁরা তদন্তের স্বার্থে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলে শুরুতে সহযোগিতা পাননি। ফলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর গেটের তালা ভেঙে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়েন তদন্তকারীরা। এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকাতেও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

বাড়ির ভিতরে প্রবেশের পর একাধিক ঘরে তল্লাশি চালানো হয় বলে জানা গিয়েছে। সূত্রের দাবি, গোটা তল্লাশি প্রক্রিয়ার ভিডিওগ্রাফি করা হয়েছে, যাতে অভিযানের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত থাকে। তদন্তকারীরা বাড়ির বিভিন্ন অংশ খতিয়ে দেখেন এবং সুমিত রায়ের উপস্থিতির কোনও প্রমাণ বা সূত্র খোঁজার চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ওই বাড়িতে পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

তল্লাশি অভিযান চলে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ধরে। ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান শেষ হয় সকাল আটটার কিছু আগে। তারপর পুলিশবাহিনী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। যদিও সূত্রের খবর, অভিযান শেষ হওয়ার পরও শালবনি থানার তদন্তকারী দল কলকাতা ছেড়ে যায়নি। সুমিত রায়ের সম্ভাব্য অন্যান্য ঠিকানা বা যোগাযোগ সূত্র খতিয়ে দেখতে তারা শহরের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাতে পারে বলেও জানা গিয়েছে। এমনকি সুমিত রায়ের বাড়িতেও তদন্তকারীরা যেতে পারেন বলে খবর।
এদিকে ভোররাতের এই তল্লাশির খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক মহলে। খবর পাওয়ামাত্রই তড়িঘড়ি কালীঘাটের উদ্দেশে রওনা দেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে প্রবেশ করেন। সূত্রের খবর, বাড়ির ভিতরে অভিষেকের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ তাঁর আলোচনা হয়। তবে কী বিষয়ে কথা হয়েছে, তা নিয়ে কেউ মুখ খোলেননি। পরে তল্লাশি শেষ হওয়ার পর তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা তাঁকে ঘিরে ধরলেও তিনি এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।

অভিযান শেষ হওয়ার পর বাড়ির বাইরে এসে প্রতিক্রিয়া দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে তল্লাশি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্টভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অভিষেক বলেন, “তালা ভেঙে ওঁরা ঢুকেছেন। গোটা বাড়ির তল্লাশি হয়েছে। কেন তল্লাশি হয়েছে, সেটা ওঁরাই ভাল বলতে পারবেন।” পরে তিনি আরও দাবি করেন, “তালা ভেঙে ঢুকে গোটা বাড়ি তল্লাশি করেছে। সব রেকর্ড রয়েছে। তদন্তে সহযোগিতা করেছি।”

অভিষেকের এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, যদি সহযোগিতা করা হয়ে থাকে, তাহলে তালা ভাঙার প্রয়োজন কেন হল? যদিও পুলিশ সূত্রের বক্তব্য, তাঁদের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য ছিল এবং তদন্তে প্রাথমিকভাবে সহযোগিতা না মেলায় তালা ভেঙে প্রবেশ করতে হয়েছে। অন্যদিকে অভিষেকের বক্তব্য, তিনি এবং তাঁর পরিবার তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। ফলে এই বিষয়টি নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ডিজে মন্তব্য সংক্রান্ত মামলাতেও তদন্ত এগোচ্ছে। শুক্রবারই সিআইডির আধিকারিকরা অভিষেকের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে সমন পৌঁছে দেন। ওই মামলায় আগামী ১৬ জুন তাঁকে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ১৫ জুন ইডি দপ্তরেও তাঁর হাজিরা দেওয়ার কথা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে একদিকে সই জালিয়াতি মামলা, অন্যদিকে ডিজে মন্তব্য বিতর্ক, তার সঙ্গে ইডির তলব— সব মিলিয়ে ইতিমধ্যেই চাপে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার মধ্যেই তাঁর আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়কে ঘিরে ওঠা আর্থিক প্রতারণার অভিযোগের তদন্তে ভোররাতে বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিল।

তদন্তকারীদের দাবি, সুমিত রায়ের সন্ধান পাওয়াই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল। যদিও অভিযানের সময় তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপ কী হবে, সুমিত রায়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কবে এবং কীভাবে তদন্তকারীরা সামনে আনতে পারবেন, সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে।
ভোররাতের এই নাটকীয় অভিযান, তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর মোতায়েন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক উপস্থিতি এবং একাধিক মামলার আবহ সব মিলিয়ে শনিবারের সকালেই রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছে এই ঘটনা। এখন নজর তদন্তের অগ্রগতি এবং সুমিত রায়ের সন্ধান মেলে কিনা, সেদিকেই।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version