Friday, August 7

সৌরভ দত্ত, কলকাতা:রাখে হরি তো মারে কে! তারাতলার ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও যেন ফের সত্যি হল সেই বহু প্রচলিত প্রবাদ। মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করে ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে জীবনের কাছে ফিরে এলেন এক শ্রমিক। নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক ভবন ভেঙে পড়ার প্রায় ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পরে বন্ধুকে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন তিনি। সেই একটি ফোনকলই শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে দিল তাঁর প্রাণ। সিনেমার গল্পকেও হার মানানো এই ঘটনা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তারাতলায়।

বুধবার দুপুর ১২টা ৭ মিনিট নাগাদ আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে তারাতলার নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক ভবন। মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় ঢেকে যায় গোটা এলাকা। ভবনের নিচে চাপা পড়ে যান বহু শ্রমিক। চারদিকে শুরু হয়ে যায় হাহাকার। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় পুলিশ, দমকল, এনডিআরএফ এবং সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দল। শুরু হয় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপ সরাতে ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিও। বুধবার রাতভর চলে উদ্ধারকাজ। একের পর এক শ্রমিককে বের করে আনা হলেও শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী এখনও কয়েকজন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছেন। তাঁদের উদ্ধারের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই বুধবার গভীর রাতে ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। জানা যায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছিলেন মনু কুমার নামে এক শ্রমিক। বিহারের মুঙ্গের জেলার বাসিন্দা মনু নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন। দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁর কোনও খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার বা সহকর্মীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেলেও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কেউ কিছু জানতে পারেনি। ফলে পরিবারের উদ্বেগও ক্রমশ বাড়ছিল।
এরই মধ্যে বুধবার গভীর রাত, প্রায় দু’টো নাগাদ আচমকা একটি ফোন আসে মনুর বন্ধু সন্তোষ কুমারের কাছে। ফোন রিসিভ করতেই সন্তোষ বুঝতে পারেন, তাঁর বন্ধু ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছেন। কথা বলার মতো অবস্থায় প্রায় ছিলেন না মনু। তবুও শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে তিনি শুধু একটি কথাই বলতে পেরেছিলেন— “আমাকে বাঁচাও।” বন্ধুর সেই অসহায় আবেদন শুনে আর সময় নষ্ট করেননি সন্তোষ। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মনুকে নিজের লোকেশন পাঠাতে বলেন। কিন্তু শারীরিক অবস্থার কারণে তা আর পাঠাতে পারেননি মনু।

বন্ধুর জীবন বাঁচানোর তাগিদে সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দেন সন্তোষ কুমার এবং তাঁর আর এক বন্ধু বিভূতি। তাঁরা দ্রুত উদ্ধারকারী দলের কাছে পৌঁছে পুরো বিষয়টি জানান। মনুর ফোনকলের কথা এবং তিনি এখনও জীবিত অবস্থায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার সম্ভাবনার কথা শুনে তৎপর হয়ে ওঠেন উদ্ধারকারীরা। এরপর মনুর মোবাইল ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করা শুরু হয়। সেই সূত্র ধরেই নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান।

রাতভর চলে তল্লাশি। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে, ঝুঁকি সামলে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধারকর্মীরা এগোতে থাকেন। অবশেষে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় ৬টা নাগাদ উদ্ধার করা হয় মনু কুমারকে। ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় কাটানোর পর তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়। উদ্ধার হওয়ার পর দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

মনুর বন্ধু সন্তোষ ও বিভূতি জানিয়েছেন, ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও মনুর মানসিক দৃঢ়তা তাঁদের বিস্মিত করেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অবস্থায়, চারপাশে অন্ধকার আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও তিনি যে নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বন্ধুকে ফোন করার কথা ভাবতে পেরেছিলেন, সেটাই সবচেয়ে আশ্চর্যজনক। তাঁদের মতে, সেই উপস্থিত বুদ্ধি এবং বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নতুন জীবন এনে দিয়েছে।

তারাতলার এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে বহু হৃদয়বিদারক ঘটনার পাশাপাশি মনু কুমারের এই উদ্ধারকাহিনি যেন আশার এক নতুন আলো দেখাল। ধ্বংসস্তূপের অন্ধকারের মধ্যেও যে জীবন লড়াই করে ফিরে আসতে পারে, মনুর ঘটনা যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে থেকে গেলো ভয়াবহ ইতিহাসের পাতায়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version