সৌরভ দত্ত, কলকাতা:
শনিবার নবান্নে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের সঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই বৈঠকে রাজ্যে অন্যান্য মন্ত্রীদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বিধায়করাও। এর আগে পশ্চিমবঙ্গে রেলের বিভিন্ন কাজে অনুমতি না দেওয়ায় আগের সরকারকে আক্রমণ করেন রেলমন্ত্রী।
বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্য-কেন্দ্রের মধ্যে ছিল ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ ভাব। তার ফলে বাংলায় রেল উন্নয়ন থমকে ছিল। তবে সরকারের পালাবদলে সে সমস্যা মিটে যাবে।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অশ্বিনী বৈষ্ণব পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচানোর জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানান। তিনি জানান, তৃণমূল সরকার রেলের কাজে অনুমতি দিত না। এতদিন পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়ন আটকে রাখা হয়েছিল। এবার কাজ করার জন্য সকলকে তৈরি হওয়ার বার্তা দেন রেলমন্ত্রী। তিনি আরও জানান, রেলের কাজ আটকাতে হাইকোর্টে গিয়েছে আগের সরকার। হাইকোর্টের রায় পছন্দ না হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছে তারা। তাঁর কথায়, “কলকাতাবাসী যাতে মেট্রো পরিষেবা না পান সেই কারণে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত ঔগিয়েছে তৃণমূল সরকার। কিন্তু এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে পুরো উদ্যোমে কাজ শুরু হবে।”
অটোতেও চড়েন রেলমন্ত্রী। যাত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেন। এরপর নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করেন রেলমন্ত্রী।
শীঘ্রই বুলেট ট্রেনের পরিষেবা পেতে চলেছেন রাজ্যবাসী। এই পরিষেবা চালু হলে মাত্র ৬ ঘণ্টায় দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি যাতায়াত করতে পারবেন যাত্রীরা। শনিবার নবান্ন থেকে একথা ঘোষণা করলেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। তিনি জানান, এই বুলেট ট্রেন দিল্লি, লখনউ, বেনারস, পাটনা হয়ে শিলিগুড়িতে পৌঁছবে। এছাড়াও আগামী ৫ বছরে রাজ্যে ৬০টি নতুন ট্রেন চালুরও আশ্বাস দেন তিনি।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে গত ১২ বছরে কলকাতা মেট্রোর উন্নয়ন সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরেন রেলমন্ত্রী। তিনি জানান, ১৯৭২ সালে চালু হওয়ার পর ৪২ বছরে মাত্র ২৮ কিমি কলকাতা মেট্রোপথের কাজ হয়েছে। কিন্তু গত ১২ বছরে মোদি জমানায় কলকাতায় ৪৫ কিলোমিটার মেট্রোপথ সম্প্রসারণ হয়েছে। তিনি আরও জানান, বন্দেভারত স্লিপার, অমৃতভারত ট্রেন পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম চালু হয়েছে। রাজ্যজুড়ে ১০২ টি স্টেশনের পুনর্নির্মাণের কাজ হবে। এর মধ্যে ১০টি স্টেশনের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে ৯টি বন্দেভারত, ১ টি বন্দেভারত স্লিপার ও ১৩টি অমৃতভারত ট্রেন চলছে। বাংলার উন্নয়নে রেলওয়ে ও নরেন্দ্র মোদির উৎসাহের কথাও এদিন ফের একবার মনে করিয়ে দেন রেলমন্ত্রী।
রেলমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, রাজ্যের প্রত্যেক জেলা রেল মানচিত্রে জুড়বে। আগামিদিনে রাজ্যে ১ লক্ষ কোটির রেলপ্রকল্পের কাজ হবে।
বাংলায় ১০২টি অমৃত ভারত স্টেশন, ৫৩৮টি ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাসের কাজ হবে। সে কারণে যেখানে জমির প্রয়োজন হবে, তা দেওয়া হবে বলেই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গণপরিবহণগুলির মধ্যে রেল অন্যতম। এখনও পর্যন্ত বাংলার একাধিক জেলা রেল মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে রেলমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, করিমপুর, তেহট্ট, জলঙ্গি, গোপীবল্লভপুর, নয়াগ্রাম, হিলি-সহ বাংলার প্রত্যেক জায়গা রেল মানচিত্রের আওতাভুক্ত করা হবে। উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ এবং জঙ্গলমহলকে যুক্ত করা হবে। তার ফলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
বৈঠক করতে এদিন সকালে দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছে বিমানবন্দর-নোয়াপাড়া মেট্রো চড়েন তিনি।
অটোতেও চড়েন রেলমন্ত্রী। যাত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেন। এরপর নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করেন রেলমন্ত্রী।
শনিবার বিকেলে চিংড়িঘাটার মেট্রোর কাজ দেখতে গিয়েছিলেন কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী। সেই কাজ ঘুরে দেখার ফাঁকেই গত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে দুষলেন তিনি। চিংড়িঘাটা মেট্রোর কাজ আটকে রেখেছিল তৃণমূল। তারা উন্নয়ন চাইত না। সেই অভিযোগ করেন তিনি। কলকাতা মহানগরের জন্য মেট্রো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
চিংড়িঘাটা মেট্রোর কাজ খতিয়ে দেখতে বাইপাস এলাকায় যান রেলমন্ত্রী। কাজ খতিয়ে দেখার পর গত তৃণমূল সরকারকে বেঁধেন তিনি। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার পদে পদে বাধা দিত, উন্নয়নের বিরোধী ছিল। তৃণমূলের সময়ে চিংড়িঘাটার মেট্রোর কাজ আটকেছিল। এই কাজ আটকানোর জন্য আদালতেও গিয়েছিল তৎকালীন সরকার। আদালত নির্দেশ দিলেও সেই শুরু হয়নি। এবার রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সেই কাজ হল। দিন কয়েকের মধ্যে এতদিনের থমকে থাকা কাজ হয়ে গেল। এই ঘটনায় প্রমাণ, এমনই জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী। গত সরকারের আমলে প্রায় দেড় বছর আটকে ছিল চিংড়িঘাটা মেট্রো প্রকল্পের কাজ। তবে ডবল ইঞ্জিন সরকার আসতেই সেই জটিলতা কেটেছে। মাত্র ১২০ ঘণ্টারও কম সময়ে দু’দফায় মেট্রো লাইন জোড়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
১৫ মে রাত ৮ টা থেকে ১৮ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ৬০ ঘণ্টা সময় বরাদ্দ ছিল প্রথম দফার কাজের জন্য। এই সময়ের মধ্যে ৩১৭ ও ৩১৮ নম্বর পিলারের মাঝে ২৮ মিটার দীর্ঘ একটি ভায়াডাক্ট বসানো হয়েছিল। ওই সময়ে ইএম বাইপাসের উল্টোডাঙাগামী লেন আংশিক বন্ধ রাখা হয়েছিল। যান নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশ কয়েকদিন। ঠিক তার ৪ দিন পর শুরু হয় দ্বিতীয় দফার কাজ। ২২ মে রাত ৮টা থেকে ২৫ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত। এই দফাতেও ৬০ ঘণ্টায় ৩১৮ ও ৩১৯ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী৩৪ মিটার দীর্ঘ ভায়াডাক্ত বসানো হয়েছে। সুতরাং দু’দফার মোট ১২০ ঘণ্টায় তিনটি পিলারের মধ্যে ৬২ মিটার ভায়াডাক্ট বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। এই কাজের জন্য ইএম বাইপাসের ইস্টার্ন ফ্ল্যাঙ্কে ট্র্যাফিক সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়।

