Friday, August 7

সৌরভ দত্ত, কলকাতা:
দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে কেন ‘ধাম’ বলা হচ্ছে, তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই বিতর্ক চলছে। অনেকেরই মতে, নানা অভিধান অনুসারে, ধামের অর্থ হল তীর্থস্থান বা আবাস। আবাস সাধারণ মানুষেরও হতে পারে। যেমন, মাতৃধাম। আবার দেবতার নামেও হতে পারে। যেমন, গোলোকধাম। কিন্তু তীর্থস্থান হতে গেলে দেবতা বা মহাপুরুষের লীলা বা অধিষ্ঠানক্ষেত্র হতে হবে। ধাম কথার অর্থ তেজ, জ্যোতিও হয়। জয়তি কনকঃ ধামা কৃষ্ণ চৈতন্য নামে। অনেকের ব্যাখ্যা, তেজোদ্দীপ্ত কেউ জন্মগ্রহণ করলে কিংবা প্রতিষ্ঠা করলে সেটা ধাম হতে পারে। নবদ্বীপে চৈতন্যদেবের জন্ম। তাই সেটি ধাম। ফলে এই সংজ্ঞায় দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে ধাম বলা যায় না।
দীঘার জগন্নাথ মন্দির আর ‘ধাম’ নয়। মঙ্গলবার ঘোষণা করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জানালেন, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝির চিঠি নিয়ে দূত হয়ে এসেছেন পুরীর বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্র। পড়শি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব মেনে নিয়েছে তাঁর সরকার। এখন দিঘার মন্দির কমপ্লেক্সের নাম হবে ‘শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ ও ‘জগন্নাথ দেব মন্দির’।
শুভেন্দু বলেন, ‘‘ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী পুরীর সাংসদ সম্বিতকে পাঠিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সকলেই চান পুজোপাঠ হোক। কিন্তু ধাম শব্দ সনাতন সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’’ তার পরেই শুভেন্দু বলেন, ‘‘বিতর্ক আগেই ছিল। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব গ্রহণ করে দিঘার ওই ক্যাম্পাস থেকে ধাম শব্দ সরিয়ে দিচ্ছি।’’ নতুন নাম কী হবে, তা-ও জানিয়েছেন শুভেন্দু।

আগের সরকারের তৈরি দিঘার জগন্নাথ মন্দির থেকে ধাম শব্দচি প্রত্যাহার করা হল।
তিনি বলেন, ‘‘পুরো কমপ্লেক্সের নাম হবে শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। যেহেতু তাতেই মন্ত্রিসভার অনুমোদন রয়েছে, হিডকোর টেন্ডার রয়েছে, সরকারি অর্থে হয়েছে। যেখানে ঠাকুরের পুজোপাঠ হয়, সেই স্থাপত্য মন্দির নামেই পরিচিত হবে। শ্রী জগন্নাথ দেব মন্দির নামে পরিচিত হবে।’’ মুখ্যমন্ত্রী এ-ও বলেন, ‘‘দিঘার মন্দিরে পুজোপাঠ ভারতীয় সংস্কৃতি, শাস্ত্রে জগন্নাথ দেবের পুজোপাঠের নিয়ম মেনে হবে।’’ পরিচালন ট্রাস্ট কমিটির বিষয়েও জানিয়ে দেওয়া হবে। ওয়েবাসাইটেও দেওয়া হবে।

কয়েকদিন আগে শুভেন্দু মায়াপুরের ইসকন মন্দিরে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, সেখানে রাধারমণের সঙ্গে দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের নাম পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের পুজোর দায়িত্বে রয়েছে ইসকন। তার পরেই পূর্বতন তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করে শুভেন্দু বলেন, ‘‘মন্দিরের নামে ধাম লেখা ঠিক হয়নি। কাগজপত্র দেখেছি, কালচারাল সেন্টার হিসাবে গড়েছিল। দ্রুত ধাম শব্দ অপসারণ করব।’’কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রাধারমণ দাস বলেন—
“আমরা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শুভেন্দু অধিকারীজির এই সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। এই বিষয়টি নিয়ে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন এবং আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে এখন থেকে এই মন্দির ‘দীঘা জগন্নাথ মন্দির’ নামে পরিচিত হবে।”
তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশার মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চেতনাকে প্রতিফলিত করে।
“প্রভু জগন্নাথ সমগ্র বিশ্বের, কিন্তু তাঁর চিরন্তন আবাস পবিত্র ওডিশা ভূমিতে। যদি এই নাম পরিবর্তনের ফলে ওডিশার মানুষের আনন্দ বৃদ্ধি পায় এবং তাঁদের ভাবাবেগের মর্যাদা রক্ষা হয়, তবে আমরা সত্যিই আনন্দিত। সর্বোপরি, আমরা সবাই এক বৃহৎ সনাতনী পরিবার, যাদের একসূত্রে বেঁধে রেখেছেন প্রভু জগন্নাথের প্রতি ভক্তি।”
রাধারমণ দাস জোর দিয়ে বলেন, এই নাম পরিবর্তনকে মতবিরোধের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটি দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার একটি সুযোগ।
“পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশা প্রভু জগন্নাথের মাধ্যমে গভীর সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক বন্ধনে আবদ্ধ। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, যখন ভক্তসমাজ ও সরকার সদিচ্ছা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভক্তিভাব নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে, তখন সমাধান স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।”
তিনি আরও বলেন, প্রভু জগন্নাথের প্রতি ভক্তিকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার জন্য এবং মতপার্থক্যের পরিবর্তে ঐক্যের বার্তা দেওয়ার জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও ওডিশা সরকার—উভয়ের প্রতিই কৃতজ্ঞ।

“প্রকৃত বিজয় কোনও নামের মধ্যে নয়। প্রকৃত বিজয় হলো, লক্ষ লক্ষ ভক্ত প্রভু জগন্নাথের আরও সান্নিধ্যে আসছেন। তাঁরা বাংলা, ওডিশা কিংবা বিশ্বের যে কোনও প্রান্ত থেকেই আসুন না কেন, জগন্নাথ সকলকে উন্মুক্ত বাহুতে স্বাগত জানান।”

রাধারমণ দাস তাঁর বক্তব্যের শেষে প্রার্থনা করেন, যাতে দীঘা জগন্নাথ মন্দির আধ্যাত্মিকতা, ভক্তি, প্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সনাতন ধর্মের প্রচারের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ক্রমাগত বিকশিত হয়।

“প্রভু জগন্নাথ পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা এবং সমগ্র বিশ্বের মানুষকে আশীর্বাদ করুন। এই পবিত্র মন্দির এমন এক স্থানে পরিণত হোক, যা হৃদয়কে একত্রিত করবে, বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সনাতন ধর্মের চিরন্তন মূল্যবোধ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করবে।”

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version