সৌরভ দত্ত, কলকাতা:
রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন স্বপন দাশগুপ্ত । আর এই নতুন গুরুদায়িত্ব পাওয়ার পরপরই রাজ্যের ধুঁকতে থাকা অর্থনৈতিক হাল ফেরানোর জন্য তাঁর মূল রণকৌশল সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা করেন।আসন্ন রাজ্য বাজেট সম্পর্কে এখনই বিস্তারিত কিছু খোলসা করতে না চাইলেও, ঠিক কীসের ওপর জোর দিয়ে তিনি রাজ্যের কোষাগার চাঙ্গা করবেন, তার একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন নতুন অর্থমন্ত্রী।
অর্থ দফতরের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে স্বপন দাশগুপ্ত সোজাসুজি জানান, এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা যে খুব একটা উজ্জ্বল বা আশাব্যঞ্জক, তা বলার সময় এখনও আসেনি। তাই সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে করের বোঝা না চাপিয়ে, বকেয়া রাজস্ব আদায়ের (রেভিনিউ) দিকে নজর দেওয়াই তাঁর প্রধান ও মূল লক্ষ্য হবে। তাঁর অভিযোগ, পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকার অনেক সময় রাজনৈতিক বা অন্য কোনও কারণে এই রেভিনিউ পুরোপুরি আদায় করেনি। ফলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যেখানে যেখানে ফাঁকফোকর বা ‘লিকেজ’ তৈরি হয়েছে, সর্বাগ্রে সেগুলির মেরামতের কাজ শুরু করতে হবে।
রাজ্যের আয়ের উৎস নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বলতেও খারাপ লাগে যে আমাদের রাজ্যে মূল আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে মদ আর পেট্রল। ওটাকে আরেকটু প্রসারিত করতে হবে। রাজস্ব ও আয়ের ভিত্তিটা আরও বড় করা দরকার। অনেক জায়গায় রাজস্বের বড়সড় ঘাটতি রয়েছে, যেটাকে অনেকে চলতি ভাষায় ‘ট্রান্সমিশন লস’ বলে থাকেন। কোষাগারের সেই লিকেজগুলিকে আমাদের যতটা সম্ভব দ্রুত বন্ধ করতে হবে।”
তাঁর সংযোজন, রাজ্যের অনেক ক্ষেত্রে যতটা রেভিনিউ পটেনশিয়াল (রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা) আছে, সেই তুলনায় হয়তো রাজস্ব তোলা হচ্ছে না। এর পেছনে প্রশাসনিক স্তরে কিছু সমস্যা থাকতে পারে। আবার এমনটাও হতে পারে যে, এর আগে যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁরা হয়তো সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে পুরো রেভিনিউটা তুলতে চাননি,সেটাও একটা বড় সমস্যা। তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য না করে স্বপনবাবু জানান, অনেক রকমের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে হবে এবং এর জন্য প্রচুর পড়াশোনা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
ভোটের মরশুমে বিজেপির দেওয়া সামাজিক প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচনের সময় দল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ক্ষমতায় এলে বার্ধক্য ভাতা ও অন্নপূর্ণা ভাতা বৃদ্ধি করা হবে – সেগুলি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে স্বপনের খোঁচা, আগের সরকারের প্রকল্পগুলি ছিল ‘ইউনিভার্সাল স্কিম’ (সর্বজনীন প্রকল্প)। তার মানে, যে কেউ গিয়েই আবেদন করে সেই টাকা নিয়ে নিতে পারতেন। ফলে পকেট মানি বা হাতের খরচ হিসেবেও অনেকে এই সরকারি অনুদান ব্যবহার করেছিল। এমনকি, শুধু মহিলারাই নন, পুরুষরাও এর সুবিধা ভোগ করায় প্রকল্পগুলি লিঙ্গ নিরপেক্ষ হয়ে গিয়েছিল। তবে এখন সবটা খতিয়ে দেখা হবে, ফলে কিছু টাকা ওখান থেকেও রাজ্য সরকারের বেঁচে যাবে বলে আশা তাঁর।
আসন্ন বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, এটি মূলত আট মাসের একটি সংক্ষিপ্ত বাজেট হতে চলেছে, যা খুব শীঘ্রই পেশ করতে হবে। তবে রাজ্য বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বড় সমস্যা হল জিএসটি । কারণ জিএসটি-র বিষয়টি এখন পুরোপুরি রাজ্যের হাতে নেই, তা নির্ধারিত হয় জিএসটি কাউন্সিলের মাধ্যমে। ওটার সুফল রাজ্য নিশ্চয়ই পায়, কিন্তু ওটার অর্থনৈতিক নীতি একা পশ্চিমবঙ্গ সরকার নির্ধারণ করতে পারে না।
ডিএ বা মহার্ঘ ভাতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বপন দাশগুপ্ত কিছুটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, “সব জিনিসের আলোচনা বা সমাধান তো আর একদিনে হয় না। এটি অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। তবে আমি সমস্যাটা খুব ভালো করেই জানি। এই সমস্যাটা ইতিমধ্যে কতটা মিট করা হয়েছে আর কতটা মেটানো বাকি আছে – সে সম্পর্কেও আমার স্পষ্ট ধারণা রয়েছে।”
সবশেষে, অর্থ দফতরের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম কোন কাজটি সবচেয়ে বেশি জরুরি বলে মনে করছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর সাফ কথা, প্রথমে একটা প্রশাসনিক তৎপরতা আনতে হবে। যেখানে যেখানে রাজস্বের লিকেজ হচ্ছে, তা কেন হচ্ছে তা খুঁজে বের করতে হবে। দফতরের সবাইকে একটা সুনির্দিষ্ট টার্গেট ও দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেওয়া হবে যে – রাজ্যের মূল লক্ষ্য, যে কোনও উপায়ে রাজ্যের রেভিনিউ বা রাজস্ব আদায়কে সর্বোচ্চ করা।

