সৌরভ দত্ত :ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একসময় দেশের ফুটবল বর্ষপঞ্জি ছিল নানা মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় সমৃদ্ধ। বর্তমানের ইন্ডিয়ান সুপার লিগ ও আই-লিগের পাশাপাশি আইএফএ শিল্ড, ফেডারেশন কাপ, রোভার্স কাপ, টাইটান কাপ, সিকিম স্বর্ণকাপ ও দার্জিলিং কাপের মতো প্রতিযোগিতাগুলি ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনায় মাতিয়ে রাখত। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল নাম ডুরান্ড কাপ।
২০২৬ সালের ডুরান্ড কাপ ১১ জুলাই থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত আয়োজিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আয়োজক কমিটি ও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন রাজ্য ও শহরের খেলার মাঠ চূড়ান্ত করার জন্য আলোচনা চালাচ্ছেন। চূড়ান্ত নির্ঘণ্ট ও আয়োজক শহরগুলির নাম শীঘ্রই ঘোষণা করা হতে পারে। ভারতীয় ফুটবলের শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রতিযোগিতা আবারও দেশের ফুটবলপ্রেমীদের উৎসবমুখর করে তুলতে প্রস্তুত।
১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ডুরান্ড কাপ এশিয়ার প্রাচীনতম এবং বিশ্বের তৃতীয় প্রাচীনতম ফুটবল প্রতিযোগিতা। ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্রসচিব স্যার হেনরি মর্টিমার ডুরান্ডের উদ্যোগে শিমলার অ্যানাডেল ময়দানে এই প্রতিযোগিতার সূচনা হয়। শুরুতে এটি ছিল ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি সামরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।
১৩৮ বছরেরও বেশি পুরোনো এই প্রতিযোগিতার আবেদন আজও অমলিন। সময়ের সঙ্গে বহু প্রতিযোগিতা হারিয়ে গেলেও ডুরান্ড কাপ তার ঐতিহ্য ও মর্যাদা ধরে রেখেছে।
ভারতীয় ফুটবলের বহু কিংবদন্তি এবং বিদেশি তারকা এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সাফল্য, ব্যর্থতা, আবেগ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনন্য মেলবন্ধন ডুরান্ড কাপকে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আসরে পরিণত করেছে।
১৮৮৮ সালে শিমলার অ্যানাডেলে ডুরান্ড কাপের যাত্রা শুরু হয়। এটি মূলত ব্রিটিশ ও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের জন্য একটি সামরিক ফুটবল প্রতিযোগিতা ছিল।
১৯৪০ সালে প্রতিযোগিতাটি শিমলা থেকে নয়াদিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৪০ সালেই মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব প্রথম ভারতীয় বেসামরিক দল হিসেবে ডুরান্ড কাপ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করে, যা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী, ডুরান্ড ফুটবল প্রতিযোগিতা সমিতি এবং সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সহযোগিতায় প্রতিযোগিতাটির পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
২০১৯ সালে ডুরান্ড কাপের সদর দপ্তর কলকাতায় স্থানান্তরিত হয় এবং এটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের তত্ত্বাবধানে আসে। এরপর থেকে কলকাতা ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন শহর এই প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
একসময় একক শহরকেন্দ্রিক এই প্রতিযোগিতা বর্তমানে বহু-রাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এতে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ, আই-লিগের শীর্ষ ক্লাবগুলির পাশাপাশি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর দলগুলিও অংশগ্রহণ করে।
ডুরান্ড কাপ জয়ী দলকে তিনটি ট্রফি প্রদান করা হয়, যা বিশ্ব ফুটবলে একটি অনন্য ঐতিহ্য।
ডুরান্ড কাপ :মূল ট্রফি, যা ‘শ্রেষ্ঠ নিদর্শন’ নামে পরিচিত।
শিমলা ট্রফি: ১৯০৪ সালে শিমলার বাসিন্দারা এই ট্রফিটি দান করেন। এটি ‘শিল্পকর্ম’ নামেও পরিচিত এবং একটি চলমান ট্রফি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
রাষ্ট্রপতি কাপ:স্বাধীনতার পর ভাইসরয় কাপের পরিবর্তে চালু হয় এই ট্রফি। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ এটি দান করেন। অন্য দুটি ট্রফির বিপরীতে রাষ্ট্রপতি কাপ বিজয়ী দল স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারে।
মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট সর্বাধিক ১৭ বার ডুরান্ড কাপ জয়ের নজির গড়েছে।অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গল ফুটবল ক্লাব ১৬ বার শিরোপা জিতেছে। লাল-হলুদের শেষ ডুরান্ড জয় আসে ২০০৪ সালে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নর্থইস্ট ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাব উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৪ সালে তারা চূড়ান্ত ম্যাচে মোহনবাগানকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শিরোপা জেতে। ২০২৫ এ ডায়মন্ডহারভার এফসি কে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয় নর্থইস্ট। পর পর দুবার তাঁরা ডুরান্ডের শিরোপা জিতে নেয়।
